মঙ্গল্বার ১৮ জুন ২০২৪
Space Advertisement
Space For advertisement
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » বীরমুক্তিযোদ্ধাদের অণুগল্প -১৯ ‘ কনেশতলা স্কুলে রাতে আমরা আর হানাদার বাহিনী পাশাপাশি ঘুুমিয়ে থাকলেও বুঝতে পারিনি…. ’


বীরমুক্তিযোদ্ধাদের অণুগল্প -১৯ ‘ কনেশতলা স্কুলে রাতে আমরা আর হানাদার বাহিনী পাশাপাশি ঘুুমিয়ে থাকলেও বুঝতে পারিনি…. ’


আমাদের কুমিল্লা .কম :
22.05.2024

শাহাজাদা এমরান ।।

যুদ্ধের যাত্রা যখন শুরু :
বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন বলেন, মুলত ৭ মার্চের পরই চট্রগ্রামের অবস্থা অন্য রকম হতে থাকে। ১০/১২ মার্চের পর থেকেই বন্দর দিয়ে অতিরিক্ত সৈন্য এবং গোলাবারুধ যে আসছে তা আমরা খবর পেতাম। এভাবেই আমরা বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে যারা বাঙ্গালী শ্রমিক ছিলাম তখন এ বিষয়ে আলোচনা করতাম। এতে আমাদের উৎসাহ দিতেন আমাদের নিরাপত্তা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা। তিনি ২২ মার্চ আমাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বললেন আর ২৩ মার্চ সকালে তিনি প্রধান হয়ে ১৩১ সদস্য বিশিষ্ট কয়েন মিল বাঙ্গালী ফোর্স গঠন করলেন । একই দিন বিকালেই বললেন, মিলে বর্তমানে যারা অবাঙ্গালী আছে তাদের ধরে ধরে একটি রুমে আটকে রাখ। এভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হওয়ার আগেই আমরা যুদ্ধ শুরু করি।

প্রশিক্ষণ যখন শুরু : ২৩ মার্চ তাদের আটক করি আর পরদিন ২৪ মার্চ উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষে তিন অবাঙ্গালী নিহত হওয়ার পর আমরা প্রশিক্ষনের জন্য একই দিন রাঙ্গামাটি যাই। পরে রাঙামাটি দিয়ে ১নং সেক্টরের ক্যাম্প সাবরুম যাই।আমাদের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাতিসা এলাকার আলী হোসেন, আবদুল কাদের,আনোয়ার হোসেনসহ আমাদের পুরো ১৩১জন আমরা অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন নুরুল হুদার নেতৃত্বে রাত ২টার দিকে যাই। আমরা ছিলাম ১নং সেক্টরের সাবরুম কেন্দ্রের প্রথম ব্যাচের যোদ্ধা। সাবরুম ক্যাম্পে আমরা প্রথম ৭ দিন প্রশিক্ষন নেই। আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর তেওয়ারী। আমাদের ১৩১ জনের মধ্যে বাছাই করে আমিসহ ২৫জনকে বগাপা প্রশিক্ষন কেন্দ্রে পাঠায় উচ্চতর প্রশিক্ষনের জন্য। বগাপা কেন্দ্রে যাওয়ার পর প্রথম দিনই মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন) আমাদের ২৫জনকে এ্যাসম্বলীতে দাঁড় করিয়ে এক আবেগঘন ভাষন দিয়ে জানতে চান, তোমরা কে কে দেশের জন্য বুকের তাজা রক্ত আজ বিলিয়ে দিতে চাও। যারা চাও তারা এক কদম করে সামনের দিকে এগিয়ে আস। পরে আমাদের এই ২৫ জনের মধ্যে আমাদের এলাকার আলী হোসেন,আমিসহ আমরা ৭ জন সামনের দিকে এগিয়ে আসলাম। আমাদের এই ৭জনকেই তিনি প্রাথমিক ভাবে ৭টি যুদ্ধের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দিলেন।

যুদ্ধের অনুপম গল্প : প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সম্মুখ সমরের যোদ্ধা আমির হোসেন বলেন, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই আমার গ্রুপকে নির্দেশ দেওয়া হলো, ফেনী জেলার শ্রী নগর সীমান্তে দিয়ে দেশে প্রবেশ করে তৎসংলগ্ন শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিতে হবে। কারণ, হানাদার বাহিনী এই ব্রিজ ব্যবহার করে ভারী অস্ত্র আনা নেওয়া করে। ঐদিনই ছিল আনুষ্ঠানিক যোদ্ধা হিসেবেও আমার প্রথম আবার গ্রুপের কমান্ডার হিসেবেও আমার প্রথম এ্যাসাইনমেন্ট। এই অভিযানে আমরা ৯ জন অংশ গ্রহন করি। হানাদার বাহিনীর কয়েকজন সদস্য সর্বদা এই ব্রিজ পাহারা দিত। এখানে এসে দেখলাম এই ব্রিজটি উড়িয়ে না দিয়ে দখল করতে পারলে আমাদের জন্যই সুবিধা হবে। মেসেজটি সাবরুম ক্যাম্পে পাঠিয়ে অনুমতি নেই। পরে এখানে আমরা খন্ড খন্ড ৭দিন যুদ্ধ করার পর ব্রিজটি হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে দখল মুক্ত করি। শুভপুর ব্রিজ মুক্ত করার এই যুদ্ধে আমরা বিজয়ী হলেও আমাদের হারাতে হয়েছে ঢাকার সন্তান শাহজালাল নামে এক সাহসী শহিদ মুক্তিযোদ্ধাকে। যুদ্ধের ৭ম দিনে সে হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহিদ হয়। আমরা তাকে জানাযা,দাফন ও কাফন ছাড়াই মাটি চাপা দিয়ে রাখতে বাধ্য হই। জীবনের প্রথম যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে সাবরুম ক্যাম্পে যাওয়ার পর সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়া খুশিতে আমাদের ৭দিন ছুটি দেন। আমরা যেন এই ৭দিন ছুটি কাটিয়ে পরবর্তী আরেকটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করতে পারি। তখন আমরা ফেনী গিয়ে বিশ্রাম সময় কাটাই। এ কয়েকদিন আমাদের খাবার কষ্ট ছিল অবর্ণনীয়। যদিও আমাদের নেতৃত্বের নির্দেশ ছিল যখন যে এলাকায় যুদ্ধ করবা তখন সে এলাকার জনগনের কাছ থেকে সার্বিক সহযোগিতা নিবা। প্রয়োজনে একটু কঠোর হলেও যুদ্ধের ময়দানের কোন সমস্যা হবে না। বিশ্রামের পর আমার অধীনে থাকা প্রতিটি যোদ্ধাই বলল, আমরা আর এই ক্যাম্পে থাকবনা। আমরা এখান থেকে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে যুদ্ধ করব। এরপর আমিসহ সবাই ফেনীর চোত্তাগোলা ক্যাম্পের ইনচার্য খাজা আহমেদের নিকট হাতিয়ার জমা দিয়ে সবাই যার যার এলাকায় চলে আসি এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের দিকে। বাড়ি এসে এক রাত থাকি। পরে ২নং সেক্টরের সাব সেক্টর নির্ভয়পুর ক্যাম্পে যোগ দেই। এই ক্যাম্প থেকে আবার আমাদের কালাকৃঞ্চ নগর ক্যাম্পেড পাঠান। তখন এই কালাকৃঞ্চ ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান,প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন, সুবেদার মাহবুবুর । এই নির্ভয়পুর ক্যাম্প থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত অসংখ্য ছোট বড় যুদ্ধে অংশ গ্রহন করি।

অক্টোবর মাসের শেষ দিকে হবে। একদিন আমাদের কমান্ডার মাহবুবুর রহমান বললেন, কুমিল্লার বর্তমানের সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারা ইউনিয়নের কনেশতলা হানাদার বাহিনীর বাংকারে আক্রমন করতে হবে। আমাদের অগ্রবর্তী দল রেকি করে জানায়, কনেশতলা স্কুলে আমাদের রাত্রি যাপন করতে হবে। এই যুদ্ধে আমরা কালাকৃঞ্চপুর ক্যাম্পের পুরো কোম্পানী চলে আসি। আমাদের একটি গ্রুপ যখন স্কুলের মাঠে এসে পৌঁছায় তখন বাজে রাত প্রায় ২টা। সবার চোখেই ঘুম । সকালে অভিযানে নামতে হবে। আমাদের আরেকটি গ্রুপ রাস্তায় ডিউটি করছে। গিয়ে দেখি স্কুলের সব কটি রুমই খালি। যে যেভাবে পারছে কোন মতে গা এলিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ছে।এর মধ্যে আমি যে রুমে ছিলাম এই রুমের একপাশে আবার হানাদার বাহিনীর কয়েকজনও ঘুমিয়ে আছে। তারা ডিউটি করে পরবর্তীদের হাতে ডিউটি হস্তান্তর করে এখানে রেস্ট নিচ্ছে। আমরা মনে করছি, এরা তো আমাদেরই লোক। হয়তো হানাদাররাও ঘুমের মধ্যে মনে করছে তারা তো আমাদেরই লোক। নিজের লোক মনে করে কেউ কাউকে ডাক দিচ্ছি না। এর মধ্যে ভোর রাতের দিকে রাস্তার পাশের খাল পাড়ে আমাদের পেট্রোল ডিউটির সাথে হঠাৎ করে কয়েকজন রাজাকারের মুখোমুখি সাক্ষাত হয়ে যায়। রাজাকার দেখে আমাদের সৈনিকদের মাথা গরম হয়ে যায়। তারা শুরু করে দিল ফায়ার। এই ফায়ারের শদ্ধে আমরা আর হানাদাররা সবাই উঠে গিয়ে ফায়ার শুরু করে দেই। যে যেভাবে পারছে ফায়ার করছে। চর্তুদিকে তখনো অন্ধকার। আমাদের রুমের হানাদার বাহিনীর সদস্যরাও রুমের বাহির হয়ে এলোপাতারী গুলাগুলি শুরু করল। তখন আমরা অধিকাংশই কিছুটা নিরাপদ দূরুত্ত্বে চলে গেলাম। কারণ, কে মুক্তিবাহিনী আর কে হানাদার ঠিক ঐ সময়ে বুঝার উপায় ছিল না। এক পর্যায়ে আমরা পূর্বদিকে আর হানাদার বাহিনী পশ্চিম দিকে অবস্থান নেয়।এ যুদ্ধে অনেক হতাহত হয়। তবে ঐ রাতে বেশীর ভাগ নিহত হয় পাঞ্জাবীরা। যার কারণে পরদিন সকালে তারা চৌয়ারা বাজার এলাকার কয়েকটি গ্রামে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং ৭/৮ জন গ্রামের নিরিহ মানুষকে হত্যা করে।

পরিচয় : মো.আমির হোসেন মজুমদার। পিতা টুকু মিয়া মজুমদার এবং মাতা সরবত বানু। পিতা-মাতার তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। তিনি ১৯৪৯ সালের ২৮ মার্চ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাতিসা ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন।
কাল পড়ুন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুল হক মজুমদারের অণুগল্প