মঙ্গল্বার ২৩ জুলাই ২০২৪
Space Advertisement
Space For advertisement


নান্দনিকতার ছোঁয়া ঐতিহ্যের খাদিতে, চাহিদা বেশি পাঞ্জাবি-থ্রিপিসের


আমাদের কুমিল্লা .কম :
08.04.2024

আবদুর রহমান ।। পবিত্র ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, কুমিল্ল¬ার ঐতিহ্যবাহী খাদি পোশাক ও কাপড়ের বাজার ততই জমে উঠছে। বিক্রেতারা জানিয়েছেন- খাদির বিভিন্ন প্রকার পোশাক থাকলেও ক্রেতাদের চাহিদার শীর্ষে রয়েছে পাঞ্জাবি আর ফতুয়া। আর মেয়েদের কাছে খাদির থ্রি-পিসের চাহিদা ব্যাপক। বর্তমানে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা নগরীর প্রতিটি খাদি দোকানেই দিনরাত ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শনিবার (৬ এপ্রিল) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নগরীর রাজগঞ্জ বাজারের পশ্চিম দিক থেকে কান্দিরপাড়ের রামঘাটলা পর্যন্ত দোকানগুলোতে ঘুরে ক্রেতাদের বেশ উপস্থিতি দেখা গেছে।
কুমিল্লার খাদি শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, শতবর্ষের ঐতিহ্য, সুনাম ও খ্যাতি অক্ষুন্ন রাখার লড়াইয়ে এখনো টিকে রয়েছে কুমিল্লার খাদি। কালের পরিক্রমায় খাদি পরিণত হয়েছে বাঙালির অন্যতম ফ্যাশন প্রিয়তায়। শৈল্পিক ছোঁয়ায় কুমিল্লার খাদি এখন দেশ-বিদেশে বেশ সমাদৃত। শতবর্ষের খাদি পণ্য তার গুণগত মান বজায় রেখে আধুনিকতার সংমিশ্রণে হাল-ফ্যাশনের প্রতিযোগিতার বাজারে চাহিদা ধরে রেখেছে।
কুমিল্লা খাদি কাপড় বিক্রেতাদের ভাষ্য- দাম অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষের কাছে খাদি পোশাকের কদর বেশি। পুরুষরা কিনছেন খাদির পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। আর নারীদের প্রিয় খাদির থ্রি-পিস। সেই সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে খাদি কাপড়ের তৈরি বিছানার চাদর ও নকশি কাঁথা। প্রতি বছরের রোজার ঈদের মতো এবারও ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে নানা ধরনের নকশায় তৈরি করা হয়েছে খাদি পোশাক।
নগরীর মনোহরপুর এলাকার ‘খাদি ভবন’ নামক দোকানের ব্যবস্থাপক বাবুল পাল বলেন, দেশ-বিদেশে এখনো খাদি কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ বছর রমজানের শুরুর দিক থেকেই বেচাকেনা ভালো। মানে ভালো দামে কম হওয়ায় মানুষ খাদি পোশাক কিনছেন। ক্রেতাদের চাহিদার শীর্ষে রয়েছে পাঞ্জাবি আর থ্রি-পিস। প্রতিনিয়ত ঐতিহ্য রক্ষা করে খাদি কাপড়ে নান্দনিকতার ছোঁয়া লাগছে; এজন্য ক্রেতারা খাদি কাপড় বেশি কিনছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে কুমিল্লা জেলায় খাদির নাম সংযুক্ত দোকান আছে চার শতাধিক। এর মধ্যে কুমিল্লা নগরীতেই রয়েছে তিন শতাধিক দোকান। নগরীর রাজগঞ্জ বাজারের পশ্চিম দিক থেকে কান্দিরপাড়ের রামঘাটলা পর্যন্ত এসব দোকানের অবস্থান। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ভারত পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহার করে নিলে কুমিল্ল¬ার খাদিশিল্পে সংকট দেখা দেয়। পরবর্তীতে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হাল ধরেন বাংলাদেশ পল্ল¬ী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) প্রতিষ্ঠাতা ড. আখতার হামিদ খান। খাদের (গর্তে) চরকায় বসে এ কাপড় তৈরি করা হয় বলে এর নামকরণ হয় ‘খাদি’। জেলা সদর ছাড়াও চান্দিনা, দেবিদ্বার উপজেলায় এখনো ঐতিহ্যগতভাবে খাদি কাপড় তৈরি হয়। হাতের পাশাপাশি মেশিনেই বর্তমানে বেশি খাদি কাপড় তৈরি হচ্ছে। এজন্য মোটা খাদি কাপড় এখন মিহি হয়েছে। কাপড়ে লেগেছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। বর্তমান খাদির পাঞ্জাবি, শার্ট, প্যান্ট, ফতুয়া, চাদর ও থ্রি-পিস বিক্রি হচ্ছে পুরো দেশেই। কুমিল্লার ঐতিহ্যের খাদি কাপড় যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও।
১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নগরীর মনোহরপুর এলাকার ‘খাদিঘর’ নামক দোকানের স্বত্বাধিকারী প্রদীপ কুমার রাহা বলেন, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও মজুরি খরচ বাড়ায় বর্তমানে খাদি কাপড়ের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে এটা ঠিক যে- দামে ও গুণমানে কুমিল্লার খাদির চেয়ে কম মূল্যে কোনো ব্র্যান্ডের কাপড় এখনো পাওয়া যায় না। হাতে তৈরি কাপড় হওয়ায় খাদির পোশাক পরে একটা ন্যাচরাল ফিল পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিদেশি দূতাবাসে খাদিসহ দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী করা যেতে পারলে এ পণ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটাবে। এখনো দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে কুমিল্লার খাদি পোশাকের।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে কুমিল¬া নগরীর কান্দিরপাড়, মনোহরপুর ও রাজগঞ্জ এলাকার দোকানগুলোতে খাদির বিভিন্ন পোশাক বেশি বিক্রি হচ্ছে। এ বছর খাদি পোশাকগুলোর মধ্যে সাদা ও রঙিন পাঞ্জাবি সর্বনিম্ন ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা, মেয়েদের থ্রি-পিস ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা, শর্ট ফতুয়া ৩০০ থেকে ২৫০০ টাকা, শাড়ি ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা, শার্ট ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দামে মিলছে। এছাড়া বিছানার চাদর ৪০০ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং নকশি কাঁথা ৩ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কুমিল্ল¬ার সামাজিক সংগঠন তিন নদী পরিষদের সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক আবুল হাসনাত বাবুল বলেন, খাদি কাপড়ের বুননে বৈচিত্র্য আসায় নারী-পুরুষ সবার কাছে যুগের পর যুগ ধরে এর জনপ্রিয়তা অক্ষুন্ন রয়েছে। ঈদ, নববর্ষ ও পূজা উপলক্ষে খাদির পাঞ্জাবি, ফতুয়া, থ্রি-পিস ও শাড়ির বেশ চাহিদা সব সময়ই থাকে। এক সময় খাদি কাপড় অনেক ভারি ছিল। তবে এখন ওই কাপড় প্রতিনিয়ত মিহি করা হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম এখন খাদি নিয়ে ভাবছে। এদের হাত ধরেই খাদি কাপড়, খাদি পাঞ্জাবি ও ফতুয়ার নকশায় বৈচিত্র্য আসছে। আমার বিশ্বাস তরুণ প্রজন্ম কুমিল্লার খাদিকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।