শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
Space Advertisement
Space For advertisement
  • প্রচ্ছদ » sub lead 2 » মনোহরগঞ্জে সওজের জায়গা দখল করে ‘বহিষ্কৃত’ ছাত্রলীগ নেতার স্থাপনা নির্মাণ


মনোহরগঞ্জে সওজের জায়গা দখল করে ‘বহিষ্কৃত’ ছাত্রলীগ নেতার স্থাপনা নির্মাণ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
04.10.2023

আবদুর রহমান ।। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন বহিষ্কৃত এক ছাত্রলীগ নেতা। গত কয়েক বছরে তিনটি দোকান নির্মাণ করে সেগুলো মাসিক ভাড়া দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে ওই ছাত্রলীগ নেতা এক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীর চলাচলের পথ বন্ধ করে সওজের আরো জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লা-নোয়খালী আঞ্চলিক মহাসড়কের মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়া বাজারের ভূঁইয়া মেডিক্যালের উত্তর পাশে। অভিযুক্ত ওই ছাত্রলীগ নেতার নাম জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া। তিনি উপজেলার উত্তর হাওলা ইউনিয়নের হাতিমারা গ্রামের প্রয়াত আবুল কালামের ছেলে। দখলের কথা স্বীকার করে ওই ছাত্রলীগ নেতা বলেছেন- ‘সরকারি খাল ভরাট করে দোকান নির্মাণ করেছি; প্রয়োজন হলে সরকার ভেঙে নিয়ে যাবে।’
উপজেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া আগে নাথেরপেটুয়া ডিগ্রী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ছিলেন। এক পর্যায়ে মাদক সেবন ও মাদকের কারবারসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সবশেষ ২০২১ সালের ৫ জুন সংগঠন বিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় তাকে বহিষ্কার করে উপজেলা ছাত্রলীগ।
এদিকে, জিয়ার দখলকৃত ওই জায়গার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী উপজেলার হাতিমারা গ্রামের বাসিন্দা মো.মিজানুর রহমানের সম্পত্তি। ওই সম্পত্তিতে বর্তমানে বাড়ি নির্মাণ করতে চাইছেন ওই প্রবাসী। কিন্তু এরই মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা জিয়া ওই প্রবাসীর চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন।
প্রবাসীর পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সওজের জায়গা হয়ে মহাসড়কে চলাচলের পথ দিতে ওই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীর কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা জিয়া। এরই মধ্যে চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় প্রবাসীর ছেলের ওপর হামলা চালানোর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় গত ২৬ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার আদালতে জিয়াকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন প্রবাসীর ছেলে জোনায়েদুর রহমান ওরফে জুলহাস।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চারলেনের কুমিল্লা-নোয়খালী আঞ্চলিক মহাসড়কের নোয়াখালীমুখী লেনের পূর্ব পাশে সওজের সম্পত্তিতে আধাপাকা ছোট একটি মার্কেট নির্মাণ করেছেন ছাত্রলীগ নেতা জিয়া। নাথেরপেটুয়া বাজারের ভূঁইয়া মেডিক্যালের উত্তর পাশেই অবস্থিত ওই মার্কেটে এরই মধ্যে তিনটি দোকান নির্মাণ করেছেন তিনি। সেগুলোতে মোটর সাইকেল গ্যারেজসহ বিভিন্ন কাজে মাসিক ভাড়া দিয়েছেন তিনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সওজের সম্পত্তিতে জিয়ার নির্মিত ওই মার্কেটের ঠিক পেছনেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মিজানুর রহমানের ১৯ শতক সম্পত্তি রয়েছে। সেখানে বর্তমানে বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন ওই প্রবাসী। মিজানুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা জিয়ার নির্মাণ করা স্থাপনার উত্তর পাশের একটু খালি জায়গা দিয়ে চলাচল করতো। সওজের মালিকানাধীন ওই খালি জায়গাতেও বর্তমানে আরেকটি দোকান নির্মাণের চেষ্টা করছেন ছাত্রলীগ নেতা জিয়া। এজন্য ওই প্রবাসীর জায়গার টিনের বেড়া ভেঙে দিয়েছেন তিনি।
প্রবাসী মিজানের ছেলে জোনায়েদুর রহমান ওরফে জুলহাস বলেন, সওজের সম্পত্তিতে ভবিষ্যতে সড়ক আরো বড় হবে। আমাদের সম্পত্তি থেকে বের হয়ে সড়কে ওঠে চলাচল করবো-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জিয়া আমাদেরকে এখানে বাড়ি করতেই দিচ্ছে না। গত ২৫ সেপ্টেম্বর আমার ওপর হামলা চালিয়ে আমাদের চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে সে। এখন বলেছে- আমরা তাকে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দিলে একমাত্র চলাচলের রাস্তাটি পাবো। না হলে এখানে বাড়ি নির্মাণ করতে পারবো না। তিনি হামলা চালিয়ে আমাদের দেওয়া টিনের বেড়া ও ঘর ভাঙচুর করেছেন। আমাকে পিটিয়েছেন। এ ঘটনায় আদালতে মামলা করেছি। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের জন্য বলেছেন। মামলায় জিয়াকে প্রধান করে চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
জুলহাস আরো বলেন, মাদক কারবার ও সেবনের জন্য তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও এখনো তার দাপট কমেনি। তার ভয়ে এলাকার মানুষ তটস্থ। তিনি এলাকায় একজন সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। এজন্য তিনি চেয়ারম্যান-মেম্বার কাউকে পাত্তা দেন না।
স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা জুয়েল মিয়া বলেন, জিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি ও ব্যক্তিগত জায়গা দখলের অনেক অভিযোগ আছে। এসব ঘটনায় আদালতে বেশ কয়েকটি মামলা চলছে। হাতিমারা গ্রামের জহিরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে এমন একটি ঘটনায় চলতি বছর আদালতে মামলা করেছেন।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নুরুন্নবী বলেন, আমরা অনেক বার সালিশ বৈঠক করে জিয়াউর রহমানকে নিষেধ করেছি প্রবাসীর সঙ্গে ঝামেলা না করার জন্য। কিন্তু তিনি কারো কথাই শুনেন না।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া বলেন, যেখানে দোকান নির্মাণ করেছি- সেই সম্পত্তি গত ৪০ বছর ধরে আমার পরিবারের দখলে। তবে এই সম্পত্তির মালিক সরকার। আমি দখলসূত্রে মালিক। সরকারের যখন দরকার হবে- তখন স্থাপনা ভেঙে দেবে বা আমরা সরিয়ে নেব। বর্তমানে যেখানে দোকার নির্মাণ করেছি এখানে আগে খাল ছিলো। কুমিল্লা-নোয়খালী আঞ্চলিক মহাসড়ক চারলেন হওয়ার সময় সওজ খালের কিছু অংশ ভরাট করেছে; বাকিটা আমি নিজের টাকায় ভরাট করেছি। শুধু আমি নই- নাথেরপেটুয়া বাজারে আরো অনেকেই এভাবে দখল করেছে।
তিনি বলেন, প্রবাসী মিজানের কাছে আমি কোন চাঁদা দাবি করিনি। বলেছি আমি ভরাট করে রাস্তা তৈরি করেছি- সেই টাকা দিতে। আগে তাদের চলাচলের পথ ছিলো অন্যপাশ দিয়ে। কিন্তু এখন তাদের সম্পত্তি ভাগভাটোয়ারা হয়ে যাওয়ায়- মিজানের চলাচলের অন্য কোন পথ নেই। এজন্য তিনি আমার সঙ্গে ঝামেলা করছেন। আমি কোন হামলা চালাইনি এবং ভাঙচুর করিনি। এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। মূলত ওই প্রবাসীর টাকা আছে- এজন্য সবাই তার পক্ষে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ, কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা বলেন, নাথেরপেটুয়া বাজারে আগেও আমরা উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অনেক অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দিয়েছি। শিগগিরই আমরা আবারো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবো। তখন এসব সকল অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হবে। কোন দখলকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।