মঙ্গল্বার ১৭ †g ২০২২
Space Advertisement
Space For advertisement


ভূমি অধিগ্রহণেই পার সাড়ে ৩ বছর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
13.04.2022

মহিউদ্দিন মাহি, কুবি ॥ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের(কুবি) অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করতেই সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ফলে ভৌত অবকাঠামোগত নির্মাণ ও অন্যান্য কাজ যথাসময়ে শেষ না হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য ১ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ১১ তম সভা। প্রকল্পের আওতায় ৫০৭ কোটি টাকায় ২০২ দশমিক ২২ একর ভূমি অধিগ্রহণের কথা থাকলেও গেল বছরের ২৪ মে ১৯৮ দশমিক ৮৯ একর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের নিকট ৪৭১ কোটি ১১ লক্ষ ২২ হাজার ৫৫ টাকার চেক হস্তান্তর করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে রোববার (১০ এপ্রিল) কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে ১৯৪ দশমিক ১৯ একর ভূমি বুঝিয়ে দেয় কুমিল্লা জেলা প্রশাসন।
২০২ দশমিক ২২ একর থেকে ১৯৪ দশমিক ১৯ একর হওয়ার বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. সানোয়ার আলী জানান, প্রকল্পের শুরুতে যে জায়গাটি নির্ধারণ করা হয়েছিল সেখানে সরকারি রাস্তা পড়ে যাওয়ায় ওই জায়গা বাদ দিয়ে অধিগ্রহণের জন্য ১৯৮ দশমিক ৮৯ একর ভূমি নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসনকে ৪৭১ কোটি (আসলে ৪৭১ কোটি ১১ লক্ষ ২২ হাজার ৫৫ টাকা) টাকার চেক দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই স্থানেই আবার বন বিভাগের ৪ দশমিক ৭ একর ভূমি সংরক্ষিত থাকায় ওই জায়গা বাদ দিয়ে ১৯৪ দশমিক ১৯ একর ভূমি অধিগ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বুঝিয়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। নির্ধারিত জায়গায় বন বিভাগের সংরক্ষিত ভূমি থাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ এ সংক্রান্ত একটি নথি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আটকে ছিল। বন বিভাগের সাথে ওই পরিমাণ জায়গা বিনিময় করা হবে এমন মর্মে ওই নথিটি ছাড়া হয়। পরবর্তীতে বন বিভাগের ওই ভূমির সমপরিমাণ জায়গা পাশ্ববর্তী কোনো স্থান থেকে অধিগ্রহণ করে ওই বিভাগকে বুঝিয়ে দিলেই ১৯৮ দশমিক ৮৯ একরে পরিণত হবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারিত ক্যাম্পাস।
তবে ভূমি অধিগ্রহণ হলেও যথা সময়ে কাজ শেষ হওয়া সম্ভব নয় মনে করে প্রকল্পের সাথে জড়িত একজন বলেন, ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না। অল্প সময়ের মধ্যে ২৬ টি স্থাপনা নির্মাণ প্রায় অসম্ভব। এজন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হবে।
এ বিষয়ে মো. সানোয়ার আলী বলেন, আমরা ডিসেম্বর নাগাদ গিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করবো। এক্ষেত্রে আবেদন এক থেকে দেড় বছরের জন্য করা হতে পারে। এ বছরের শেষ দিকে গিয়েই আমরা এ বিষয়ে উদ্যোগ নেব।
ক্যাম্পাস বিভক্তি ও ভূমি মালিকানা
২০১৮ সালে একনেকে প্রকল্পটি পাশ হওয়ার পর যারপরনাই খুশি হয় বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। তবে বর্তমান ক্যাম্পাসের পাশ্ববর্তী এলাকায় পর্যাপ্ত ভূমি খালি থাকার পরও নতুন ক্যাম্পাসের জন্য তিন কিলোমিটার দূরে রাজারখোলায় ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। প্রশাসন সদর দক্ষিণ উপজেলার লালমাই মৌজার ৭, ৯, ১২ ও ১৩ নম্বর শিটে অন্তর্ভুক্ত ওই জায়গা অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেসময় ক্যাম্পাস দ্বিখণ্ডনের প্রতিবাদে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সাথে যোগ দেয় এলাকাবাসীও। তবে দু’ক্যাম্পাসের মধ্যে স্বতন্ত্র সড়ক তৈরির আশ্বাস দিয়ে সেসময় আন্দোলন থামায় কর্তৃপক্ষ।
আবার ২০১৯ সালের ৩০ মে বর্তমান ক্যাম্পাসের পাশে অধিগ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা আছে দাবি করে ক্যাম্পাসকে দ্বিখণ্ডিত না করার জন্য আইনি নোটিশ পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মো. কামাল হোসেন। সেসময় ১৩ জন বাদীর পক্ষে পাঠানো ওই নোটিশের জবাব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন।
সর্বশেষ চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি আবারও অখণ্ড ক্যাম্পাসের দাবিতে মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে চড়ামূল্যে জায়গা বিক্রির জন্য একনেকে প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার আগেই রাজারখোলায় ভূমি কিনে রেখেছিলো রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালীরা। এ তালিকায় আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের নামও। চলতি বছরের ৭ই ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রধান সংবাদে দাবি করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২৭ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা এবং স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও তার ঘনিষ্ঠজনেরাসহ ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতারা নামে-বেনামে রাজারখোলায় বিভিন্ন দাগে জায়গা কিনে রেখেছেন। পাহাড়ি অঞ্চলের এসব জায়গা গত কয়েক দশকে বেচাকেনা না হলেও ২০১৮ সালের পর হুট করেই নিজেদের দখলে নিতে শুরু করে তারা। এক্ষেত্রে ওই জায়গায় বসবাসকারী বিভিন্ন উপজাতি ও স্থানীয়দেরকে নামমাত্র মূল্যে, কাউকে পরবর্তীতে টাকা দেওয়ার কথা বলে, আবার অনেককে নির্যাতন করে জমি কিনে নেন তারা।
উচ্ছেদ হচ্ছে উপজাতি ও জীববৈচিত্র্য
বন ও পাহাড়ি অঞ্চলে ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ করার ফলে উচ্ছেদ হতে হবে সেখানকার বসতি ত্রিপুরা উপজাতিদের। লালমাই পাহাড়ে বসবাসরত ত্রিপুরা উপজাতিদের অন্তত দু’টি পল্লী আছে অধিগ্রহণকৃত এলাকায়। বিভিন্ন সময় তাদেরকে নির্যাতন করেই প্রভাবশালীরা জমির মালিকানা ছিনিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই পল্লীর একজন বসতি বলেন, একরাতে ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে ১০-১২ জন লোক এসে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ভূমির মালিকানা দখল করে নিলো। প্রাণের মায়ায় কাউকে কখনও বলতেও পারি না এসব। এছাড়া ওই স্থানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে জীববৈচিত্র্য ক্ষতির মুখে পড়বে বলেও দাবি করেছেন অনেকে।
৬৮ শতাংশ ভূমিই অকেজো!
অধিগ্রহণকৃত ১৯৪ দশমিক ১৯ একর ভূমির প্রায় ৬৮ শতাংশ ভূমিই বনজঙ্গল, পাহাড় ও টিলায় ঢাকা। ফলে এসব ভূমি কখনো পূর্ণাঙ্গ কাজে লাগানো যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক সানোয়ার আলী বলেন, আমরা বিএনবিসি (বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড) অনুসরণ করেই স্থাপনা নির্মাণ করবো। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই আমরা সব জায়গা ব্যবহার করতে পারবো না। পুরো জায়গা জুড়ে আমরা কখনোই স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবো না।
এদিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০২১ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ব্যাটালিয়ন ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের অধীনে ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়াও ১০০ একর ভূমি উন্নয়ন, চারটি ১০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন, দ্বিতীয় প্রশাসনিক ভবন, চারটি ১০ তলা আবাসিক হল, উপাচার্যের বাসভবন, শিক্ষকদের আবাসিক ভবন, ১০ তলা ডরমেটরি, কর্মচারীদের আবাসিক ভবন, স্কুল বিল্ডিং, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, অডিটোরিয়াম, ইন্টারন্যাশনাল কমপ্লেক্স, মেডিক্যাল ও ডে-কেয়ার সেন্টার, কেন্দ্রীয় মসজিদ, স্মৃতিস্তম্ভ, স্পোর্টস কমপে¬ক্স, পারিবারিক বিনোদন এলাকা উন্নয়ন, ৫০ হাজার বর্গমিটার অভ্যন্তরীণ রাস্তা, লেক খনন, ব্রিজ নির্মাণ ও ওয়াচ টাওয়ার ছাড়াও বেশকিছু যানবাহন ক্রয়ের কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক নির্মাণ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড এ. এফ. এম. আবদুল মঈন বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করে শুধুমাত্র নতুন ক্যাম্পাসের কাজ শুরু করতে চেয়েছি। প্রশাসন আমাদেরকে ভূমি হস্তান্তর করেছে। আমরা এখন পুরোদমে উন্নয়ন প্রকল্প চালাতে পারবো।