বুধবার ১০ অগাস্ট ২০২২
Space Advertisement
Space For advertisement


এখনো সরকারী স্বীকৃতি জুটেনি বীরাঙ্গণা মমতাজ বেগমের কপালে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
07.07.2022

শাহাজাদা এমরান ।। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদার বাহিনী আমাদের যে সকল মা-বোনদের উপর অত্যাচার, নিপীড়ন চালিয়েছিলেন তাদেরই একজন হলেন মমতাজ বেগম। বিয়ের মেহেদি তখনো তার হাত থেকে শুকায়নি। স্বামী, শ্বাশুরী ও শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের নিয়ে নববধুটি যখন রঙিন স্বপ্নে বিভোর ঠিক তখনি তার জীবনে নেমে আসে অমাবশ্যার কালো আঁধার। যে আঁধারে আঁধারে কেটে গেছে তার জীবনের ৬৭টি বসন্ত। স্বাধীনতার ৫১ বছরে এসেও মাত্র একটি ঘরের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এই বীর নারী। বীর নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিও এখনো জুটেনি তার ভাগ্যে। নিজে তো অসুস্থ আছেনই সাথে অসুস্থ বৃদ্ধ স্বামী নিয়েও বেশ কষ্টে দিনযাপন করছেন তিনি। ৭১’কে নিয়ে সারা জীবন মানুষের কটু কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত -পরিশ্রান্ত মমতাজের শেষ চাওয়া শুধুই মাত্র মাথা গোঁজার একটি ঘর।
বলছিলাম কুমিল্ল¬ার আদর্শ সদর উপজেলার কালির বাজার ইউনিয়নের আনন্দপুর গ্রামের মনু মিয়ার স্ত্রী মমতাজ বেগমের কথা। তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জননী তিনি। তিন ছেলেই কাজ করে দিন মজুরের। কোন দিন কাজ না পেলে চুলায় আগুন জ¦লে না। তার উপর বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবা-মা। ছোট একটি ঘরে থাকতে হয় গাদাগাদি করে। বৃষ্টির পানি বাহিরে পড়ার আগেই পুরো ঘরময় সয়লাভ হয়ে যায় ভিজে।
১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে মমতাজ-মনু মিয়ার দাম্পত্য জীবন শুরু হয়। তখন স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু না হলেও দেশের অবস্থা ভাল ছিল না বলে মমতাজ বেগম জানান। অজোপাড়াগাঁয়ের টু-থ্রি পড়া মেয়ে ঢেড় বুঝতে পারতেন ঢাকায় কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। তখন সারা দেশেই থমথম অবস্থা বিরাজ করছিল। বিয়ের পর দিনই স্বামীর সাথে শ্বশুর বাড়ি সদরের আনন্দপুর গ্রামে চলে আসেন মমতাজ বেগম।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের বৈশাখ মাসের কোন এক সকাল, তখন ৮টা কি ৯ টা হবে। শ্বাশুড়ী, স্বামী ও ভাশুরকে নাস্তা দিয়েছেন। সবার খাওয়া শেষ। এখন তিনি নাস্তা করবেন। ঠিক এই সময় গ্রামে খবর এলো পাক বাহিনী গ্রামে প্রবেশ করেছে। গ্রামের গরু-ছাগল নিয়ে যাচ্ছে। যুবক ছেলেদের মারধর করছে আর যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচেছ। এ কথা শুনবার পর আমার শ্বাশুড়ী মা বলল, বউ পালাও- একথা বলে তিনি নিজেই দিলেন দৌঁড়। এই বাড়িতে আমি বউ হয়ে আসছি মাত্র ৩ মাস হতে চলল। ভালভাবে সবার বাড়ি ঘর চিনি না। কোন দিকে যাব বুঝতে পারছি না।
নাস্তা আর খাওয়া হল না। দিলাম হরুজী বাড়ির দিকে দৌঁড়। যেই মাত্র হরুজী বাড়ির উঠানে এলাম ওমা! এসেই দেখি ৭/৮ জন পাক আর্মি আমার সামনে দন্ডায়মান। দৌঁড়ের কারণে আমি হাঁপাচ্ছিলাম। অমনি একজন আমার চুলের খোঁপা ধরে বিজাতীয় ভাষায় যেন কি বলল, বুঝলাম না। তারা একটি ঘরে নিয়ে আমাকে ব্যাপক নির্যাতন করল। বাপ ভাই ডেকেও তাদের হাত থেকে রেহাই পেলাম না।
এক সময় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান যখন ফিরে এল তখন দেখি চারদিকে অন্ধকার। চোখের পানি মুছতে মুছতে অজানা আশংকা নিয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফিরি। ভাবছি হয়তো আজই আমার সংসার জীবন শেষ। স্বামী আমাকে তাড়িয়ে দেবে। কিন্ত না। ঘরে ঢুকেই দেখি সবাই আমার জন্য অস্থির হয়ে আছে। আমি হাউমাউ করে কেঁদে বিছানায় ঢলে পড়লাম। এমন সময় আমার ভাশুর ফজর আলী, স্বামী মনু মিয়া ও শ্বাশুড়ীসহ সবাই আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, যা ঘটেছে তার বিচার আল্লাহ করবেন। এতে তোমার কোন দোষ নেই। ভোর রাতে বরুড়ায় আমরা সবাই চলে যাব। এই গ্রামে আর না।
মনু মিয়া তার স্ত্রী মমতাজ বেগমকে নিয়ে ভোর রাতেই বাবার ফুফুর বাড়ি বরুড়া উপজেলার কাশেড্ডা গ্রামে চলে গেল। যাতে পাছে লোকে মমতাজ বেগমকে কিছু বলতে না পারে।
দেশ স্বাধীন হলো ১৬ ডিসেম্বর। মনু মিয়া তার স্ত্রী নির্যাতিতা মমতাজ বেগমকে নিয়ে ১৭ ডিসেম্বর সকালে নিজ বাড়ি আনন্দপুর ফিরলেন। মমতাজ বেগম লক্ষ্য করলেন, এতদিন যারা তাকে আদর করত, ডাক খোঁজ নিত, তারা এখন দূর থেকে তাকে আড় চোখে দেখে। কেউবা তাকে সান্ত্বনার নামে খোঁচা দিয়ে কথা বলে, তার চাপিয়ে রাখা কষ্টকে উসকে দেয়। তবে সান্ত্বনা এই যে, স্বামীর ঘরের কেউ-ই তাকে এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র দায়ী করে নি। বরং তার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছে।
মমতাজ বেগম আরো বলেন, ’৭১ সালের এই দুঃখজনক ঘটনার কারণে কখনো বেশী মানুষের সামনে গিয়ে দাঁড়াইনি। স্বজনদের নানা অনুষ্ঠানে যাই নি। যদি কখনো তারা এ প্রসঙ্গে কোন প্রশ্ন করে। কত নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে যে গত ৫১ বছর ধরে বেঁচে আছি তা কাউকে বুঝাতে পারব না। শুনেছি, এ রকম নির্যাতিত মহিলাদের সরকারের পক্ষ থেকে বীরঙ্গনা উপাধি দিয়ে নানা সাহায্য সহযোগিতা করছে। কিন্ত গত ৫১ বছরে কেউ আমাদের খোঁজ নেয় নি। শুধু ২০১৫ সালে জেলা প্রশাসক কুমিল্লায় নিয়ে আমাদের বীরাঙ্গণার স্বীকৃতি দিয়ে একটু খাস জমি দিয়েছে এই যা। আপনি ( প্রতিবেদক) লেখালেখি করার পর আমাদের বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃুতি নিয়ে কিছু দিন ঢাকায় দৌঁড়াদৌঁড়ি করানো হয়েছে। এখন আর কোন খবর নেই। সরকার কি আমি মরে গেলে আমাকে স্বীকৃতি দিবে ক্ষুদ্ধ কন্ঠে বলেন মমতাজ বেগম।
বীরাঙ্গণা মমতাজ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বাদানকারী আওয়ামীলীগ বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায়। জাতীর জনকের কণ্যা বর্তমানে টানা তিন বারের প্রধান মন্ত্রী। তারপরেও কেন আমি স্বীকৃতি পাব না। আমার মত অনেকেই বীর নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছে। আমি মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি , মাগো, দয়া করে আমাকে সরকারী স্বীকৃতিটা দেন।
কুমিল্লা সদর আসনের এমপি ,কুমিল্লা মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী আ ক ম বাহা উদ্দিন বাহারকে এই প্রতিবেদকের মাধ্যমে অনুরোধ জানিয়ে বীরাঙ্গণা মমতাজ বেগম কান্না জর্জরিত কন্ঠে বলেন, এমপি সাহেব, শুনেছি আপনি অনেক মানুষের উপকার করেন। দয়া করে দেইখ্যা যান আমি আমার স্বামী সন্তানদের নিয়া কোন ঘরে থাকি। আপনার কাছে আমার একটাই অনুরোধ, আপনি আমাকে একটা ঘর কইরা দেন। তাহলে মইরা গিয়াও আমি শান্তি পামু।