শুক্রবার ১২ অগাস্ট ২০২২
Space Advertisement
Space For advertisement


কার গুলিতে ঝরে গেল পাঁচটি প্রাণ, বলছে না কেউই


আমাদের কুমিল্লা .কম :
30.10.2021

নিউজ ডেস্ক ।।
কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার খবরে গত ১৩ অক্টোবর রাতে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে ১২টি মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ওই রাতে বিক্ষুব্ধ মুসল্লিদের নিবৃত্ত করতে পুলিশ প্রায় ১০৯ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে, নিহত হয় ৫ জন। ঘটনার রাতে চাঁদুপরে তিনজন, পরদিন কুমিল্লায় একজন ও ২০ অক্টোবর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় মারা যায় আরো একজন। ঘটনার ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো থমথমে হাজীগঞ্জ, রয়ে গেছে ঘটনার ক্ষত। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বললেও চাপা আতঙ্ক আর ক্ষোভ আছে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে। নিহত পাঁচজনের পরিবারই বলছে, তাদের স্বজনদের কেউই ওইদিন মন্দিরে হামলা করেনি, বরং পুলিশ অতর্কিত গুলি করায় প্রাণ যায় তাদের।
হাজীগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে নির্মাণাধীন বিজনেস পার্ক ট্রেড সেন্টার। এই ভবনের আটতলায় গুলিতে প্রাণ হারায় রাজমিস্ত্রিদের সর্দার মো. বাবলু (৩৫)। আটতলার নির্মাণাধীন লিফটের সামনে এখনো ছোপ ছোপ রক্ত কালো হয়ে আছে। পূব পাশের সিঁড়িতে এখনো গুলির আঘাতে টাইলস ভেঙ্গে যাওয়ার চিহ্ন। বাবলুর চাচাতো ভাই মোশাররফ ওইদিন রাতে বাবলুর সাথেই ছিলেন। তিনি টিবিএসকে জানান, বাবলু থাকতেন ওই ভবনের সাততলায়।
“এশার নামাজের পর থেকে বিশ্বরোড এলাকার দিকে লোকজন জমায়েত হতে শুরু করে। কলেজ রোড এলাকা থেকে কিউসি টাওয়ার পুরো রাস্তায় লোকজন বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেছিল। সাড়ে আটটার কিছু আগে পুলিশ গোলাগুলি শুরু করলে মুহুর্মুহু শব্দ আর চিৎকার শুনতে পাই। আমরা আটতলার পশ্চিম পাশের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রায় ২০০ মিটার দূরে কী হচ্ছিল দেখছিলাম। সাড়ে আটটার দিকে আমার একটা ফোন আসলে উপরের তলার সিঁড়ির দিকে চলে যাই। ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎই গগনবিদারী চিৎকার শুনতে পাই। গিয়ে দেখি পুরো ফ্লোর রক্তে ভেসে গেছে। বাবলু ভাই আট তলার ফ্লোরে ঢলে পড়েছেন। কাছে গিয়ে দেখি, একটি বুলেট তার চোখের উপরের দিকে কপাল ভেদ করে মাথার পেছন দিকে বেরিয়ে গেছে”।
“নিচে বিক্ষুব্ধ মানুষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছিল, এর মাঝে আবার পুলিশও গুলি ছুঁড়ছিল। এত কিছুর মাঝে তাকে আটতলা থেকে নিচে নামিয়ে গাড়িতে তুলতে অনেক দেরি হয়ে যায়। পরে হাজীগঞ্জের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলেও সেখান থেকে চাঁদপুরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। ডাক্তাররা বলেন, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা গেছে বাবলু। পরদিন সকালে ময়নাতদন্তের পর লাশ বুঝে নেই আমরা”।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগদাঙ্গার সুন্দরপুরের বাবলু প্রায় চার বছর আগে ১৭-১৮ জনের একটি দল নিয়ে এই ভবনে কাজ করতে আসেন বলে জানান তার সাথে থাকা আরেক রাজমিস্ত্রি ইসহাক। তিনি ঘটনার সময় বাবলুর পাশেই ছিলেন।
“ভয়ে-আতঙ্কে আমরা নিচের দিকে যাইনি, নিচের রাস্তায় তখন গোলাগুলি চলে। আটতলায় দাঁড়িয়ে আমরা নিচে কী হচ্ছিল দেখছিলাম। প্রায় ২০০ মিটার দূর থেকে কিউসি টাওয়ারের দিক থেকে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ আসছিল। তবে গুলি করা হচ্ছিল রাস্তায় থাকা বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে। গুলি তো উপরে আসার কথা না। আর আমরা অনেক দূরে, তাও বিল্ডিংয়ের উপরে ছিলাম। এর মাঝেই কোথা থেকে জানি একটা গুলি ছুটে আসে। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই গুলিটা বাবলুর মাথায় লাগে”।
বাবলুর চাচাতো ভাই মোশাররফ ক্ষোভ প্রকাশ করে টিবিএসকে বলেন, “এক দল কোরআর অবমাননার দাবিতে প্রতিবাদ করেছে। আরেকদল বলছে তাদের মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে, কিন্তু আমার ভাইয়ের কি অপরাধ? সে তো বিক্ষোভেও যায়নি, আটতলার উপর থেকে শুধু দেখছিল। এটাই কি তার অপরাধ, নাকি যারা ধর্মের নামে মারামারি করছে তারা অপরাধী? আমার নিরপরাধ ভাইকে এভাবে মারা হলো। পুলিশের গুলিই বা কেন এত উপরের তলায় আসবে?”
বাবলুর স্ত্রী বেবি আরা খাতুন স্বামীকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান। তিনি বলেন, “বাবার গুলি খাওয়া শরীর দেখার পর থেকে নয় বছরের একটা মেয়ে আর পাঁচ বছরের আরেকটা মেয়ে নিথর হয়ে গেছে। স্কুলেও যেতে পারছে না। বাড়িতে একটা ঘর নাই, আয়-রোজগারও বন্ধ। কোনও সাহায্যও পাই নাই, পথে আসা দাঁড়ানো ছাড়া আর উপায় রইলো না।”
বিচার চান কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমাগো লাইগে কি আর বিচার? সেইটা তো বরলোকেগো লাইগা?”
বাবলু যে ভবনে কাজ করতো সেটি মূলত হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের ওয়াকফ সম্পত্তি, যার মোতয়ালী-দেখভালকারী ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবির। তিনি টিবিএসকে জানান, “ঘটনার রাতে বাবলুর সাথে আরো ১৬-১৭ জন শ্রমিক ছিল। এরাই মূলত আমাদের ১২ তলা বাণিজ্যিক ভবনটির কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিল। সহকর্মীদের একজনকে হারিয়ে তারা রাগে-ক্ষোভে, দুঃখে গত রবিবার হাজীগঞ্জ ছেড়ে যায়”। ভবনের পক্ষ থেকে কোন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি কোন উত্তর দেননি।
এতো গেল, নির্মাণ শ্রমিক বাবলুর কথা। হাজীগঞ্জের কলেজরোডের কলাবিক্রেতা আব্বাস উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ শামীম হোসেন (১৮)। তার ভাই মোহাম্মদ আরিফ বলেন, “মিছিল-মিটিংয়ে যাইলে কি আর আমাদের পেটে ভাত আইবো, আমরা কর্ম করে খাই। আমার ভাই ভ্যানে করে কলা বিক্রি করতো, কলেজ রোড থেকে কলা বিক্রি করতে করতে হাজীগঞ্জ বিশ্বরোডের দিকে আসছিল। এমন সময় এশিয়া ব্যাংকের সামনে গোলাগুলিতে পড়ে যায়। রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত ভাইয়ের কোন খবর পাচ্ছিলাম না। পরদিন কুমিল্লা মেডিকেল থেকে তার মরদেহ আনা হয়। আর কত দিন এভাবে গরিবের ছেলেরা মারা যাবে, ধর্মের নামে, রাজনীতির নামে।
“গত কয়েকদিনে কেউ আমাদের খোঁজও নেয় নাই। শরমের কথা বলে লাভ কি, ঘরে এখন খাবার জোগাতেই টান পড়ে যায়। বিচার চাইয়্যা কি হবে?”
শামীমের কাছ থেকে গোলাগুলির আধঘণ্টা আগে কলা কিনে বাড়ি ফেরেন স্থানীয় মোহাম্মদ হোসাইন বেপারী। তিনি আধঘন্টা আগেও শামীমকে কোন রকম উত্তেজিত বা বিক্ষুব্ধ অবস্থায় দেখিনি। তিনি টিবিএসকে বলেন, “পৌনে আটটার দিকে কলেজ রোডের মুখে শামীমের ভ্যান থেকে কলা নিয়ে আসি। পরে এসে শুনি শামীমকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা কখনো শামীমকে মিটিং-মিছিল কিংবা ধর্ম নিয়েও কথা বলতে দেখিনি। কলা বেঁচে যার দিন চলে, তাকে পুলিশের গুলিতে মরতে হলো। অথচ মূল হামলাকারীরা এখন লাপাত্তা”।
এদিকে, রান্ধুনীমুড়া এলাকার ইয়াসিন হোসেন হৃদয় (১৫) শহরের একটি কারিগরি ইন্সটিটিউটে পড়তো। তার দাদি ফজর বানু (৭১) বলেন, “ওইদিন মাগরিবের নামাজের পর মায়ের বানানো পিঠা খাচ্ছিল হৃদয়। ওই সময় কে যেন ডাক দিয়ে নিয়ে যায় তাকে। এরপর তো রাতের বেলা তার লাশ পাইলাম। নাতিটা পানি চাইয়া চাইয়া তড়পাইছে, কেউ দেয় নাই। এভাবেই মারা গেল, পুলিশ নির্বিচারে গুলি করেছে। একটু পিটাইয়া দৌড়ানি দিলেও তো হইতো। পঙ্গু হইয়া বাঁইচা থাকলেও হইতো”।
ওই এলাকা থেকে মিছিলে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যায় আল আমিন (১৮) নামে আরো একজন।
এর বাইরে, গাড়িচালক সাগর হোসেন (৩২) এই ঘটনায় গুলিতে মারা যান। তারা বাবা মোবারক হোসেন জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বাড়ি হলেও সাগর থাকতো মুকিমাবাদ ৫ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায়। সেখানে বিয়ে করে থিতু হন সাগর। পেশায় পিকআপ চালক সাগর ওইদিন হাজীগঞ্জ থেকে পিকআপ নিয়ে ফেরার পথে গোলাগুলিতে পড়ে মারা যায় বলে দাবি বাবা মোবারক হোসেনের।
এছাড়া আরেক নিহত আল আমিনের মাও জানান, তার ছেলে মাগরিবের নামাজের পর একটি মিছিলের সাথে দেখতে দেখতে হাজীগঞ্জ পর্যন্ত যায়। সে কোন ধর্মের বিরোধিতা বা মন্দির ভাঙতে যায়নি।
“আমার পোলা লাশ হইয়া ফিরলো, পুলিশ সতর্কও করলো না, নির্বিচারে গুলি চালিয়ে দিল।”
এদিকে, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতাকে মোকাবেলার শুরুতেই মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে বলেও এক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আসক এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ শুরুতেই গুলি শুরু করে। এর আগের যে কয়েকটি ধাপ আছে তার কোনটিই তারা অনুসরণ করেনি কিংবা অন্য কোন কম-ক্ষতিকর কৌশল গ্রহণ করেনি।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহেল মাহমুদ বলেন, পুলিশ কোন নিরপরাধ মানুষের উপর গুলি চালায়নি। ভ্যানে করে পাথর নিয়ে হাজীগঞ্জে মন্দিরে হামলা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। তবে, নির্মাণ শ্রমিক বাবলুর মৃত্যুর ঘটনাটি কিছুটা সন্দেহজনক।
“সিআইডি এর মধ্যেই ক্রাইম সিন, বুলেট ও ব্যালাস্টিক রিপোর্টের জন্য আলামত নিয়ে গেছে। ঘটনার দিন আমরা অবৈধ অস্ত্র থেকে গুলি করার মতোও শব্দ শুনেছি। তবে, সেটা নিশ্চিত নই, অবৈধ অস্ত্র নাকি ককটেল বা অন্য কিছু। সিআইডির প্রতিবেদনে পরিষ্কার হবে সে আসলে কার গুলিতে মারা গেছে।” শুরুতেই কেন গুলি করতে হলো, এমন প্রশ্নে তিনি কোন মন্তব্য করতে চাননি।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক শহীদুল হক টিবিএসকে বলেন, “দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের কয়েকটি ধাপ আছে। পানি মারা, টিয়ারশেল, গ্যাস মারার অনেক পরে রাবার বুলেট মারবে। বারবার জনগণকে ছত্রভঙ্গ হতে মাইকিং করবে, সরে যেতে বলবে। সবশেষ ধাপ হিসেবে একেবারে জনবিধ্বংসী পরিস্থিতি তৈরি হলে গুলি করবে, তবে তারও আগে প্রাণঘাতী গুলি করা হচ্ছে- এমন সতর্কতা প্রচার করতে হবে। হাজীগঞ্জের ঘটনায় তা মানা না হলে বিষয়টিতে বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। আসকের পর্যবেক্ষণ সত্যি হলে এটি আসলেই দুঃখজনক ও ঠিক হয়নি”।
উল্লেখ্য, হাজীগঞ্জে মন্দিরে হামলার ঘটনায় ১০টি মামলায় ৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব মামলায় নামে-বেনামে ২০০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, পুলিশের দায়ের করা একটা মামলায় বলা হয়েছে, পুলিশ উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে দমাতে না পেরে ১০৯ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে।